Showing posts with label ভ্রমন. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমন. Show all posts

Nov 20, 2011

শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানি, কিলোমিটার জিরো, প্যারিস (বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বইয়ের দোকান)

একখানা টেবিল ঘিরে চলছে জম্পেশ আড্ডা। উপস্থিত আছেন এজরা পাউন্ড, গ্যারট্রুড স্টেইন, হেনরি মিলার, জেমস জয়েস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, সিনক্লেয়ার লুইস, স্কট ফিটজেরাল্ড, স্যামুয়েল বেকেট, পল ভ্যালেরি। তুমুল হৈ হট্টগোল, করতালির সমাহার। আড্ডার বিষয়বস্তু- সমকালীন সাহিত্য। নিশ্চয়ই ভাবছেন বিশ্বসাহিত্যের এই রথী-মহারথীরা একাট্টা হয়েছেন এমন কোন আড্ডায়! আজ্ঞে না, আমি যে সময়ের ছবি আঁকছি তখন একমাত্র মহামতি স্টেইন আর পাউন্ড বাদে বাকী অন্যদের নাম বিশ্ব তো দূরে থাক পরিবারের বাইরেই কেউ জানত না। তবে এই আড্ডা থেকেই আস্তে আস্তে ক্ষুরধার হতে থাকে তাদের লেখনী, ছড়িয়ে পড়তে থাকে যশ, ছিন্নঝুলি ভরে উঠতে থাকে পুরস্কারের পর পুরস্কারে। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হন এখানকার বেশ কজন, কিন্তু সবাই-ই পান একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার- পাঠকের অকৃত্রিম ভালবাসা আর লেখনীর অমরত্ব। আড্ডার স্থান- শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানি, এক জীর্ণ পুরনো বইয়ের দোকান, কিলোমিটার জিরো প্যারিস।
shakesand-co
শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানিকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বইয়ের দোকান, নোতরদাম গির্জা থেকে এক মিনিটের হাঁটা দূরত্বে সীন নদীর পাড়ে অবস্থিত, ফরাসী দেশে ইংরেজি ও আন্তর্জাতিকতার ঝান্ডা ওড়ানো এই একপৌরে দোকানটিকেই ধরা হয় মহানগরী প্যারিসের কেন্দ্রবিন্দু, যার জন্যই এর অবস্থানকে বলে কিলোমিটার জিরো! যেদিন থেকেই জেনেছি এই অসাধারণ ঐতিহাসিক স্থানটির কথা, মনের গহনে সুতীব্র ইচ্ছা জেগেছে মাদার অফ লিটারেচার বা সাহিত্য জননী খ্যাত সিলভিয়া বীচ হুইটম্যানের প্রতিষ্ঠিত এই সাহিত্য তীর্থ পরিদর্শনের। ১৯১৯ সালে যাত্রা শুরুর পর এখানে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তীর। খুব দ্রুত বই বেচার দোকান থেকে বিনে পয়সায় বই ধার দেবার ও কফিপানের জনপ্রিয় আসরে পরিণত হয় তা, আসতে থাকেন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে তরুণ লেখকেরা যাদের মনে সোনালী স্বপ্ন লেখক হবার, দিবা রাত্রি লিখে যাচ্ছেন নতুন স্বাদের সাহিত্য কিন্তু প্রকাশকদের কাছে হালে পানি পান না একেবারেই নবিশ বলে, তাদের দল ভারী হতে থাকে দিনে দিনে।
সাহিত্যচর্চার বাসনা নিয়ে ইতালি যাচ্ছিলেন সাবেক আমেরিকান সৈন্য আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, পথে এক শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে প্যারিসে এসে আস্তানা গাড়েন। ক্লায় ক্লেশে কেরানীগিরি করে জীবন চালাচ্ছিলেন জেমস জয়েস, বিশাল বই ইউলিসিস লেখা প্রায় শেষ, কিন্তু ছাপাতে রাজি হচ্ছে না কেউ, এগিয়ে এলেন সিলভিয়া বীচ হুইটম্যান, এগিয়ে এল শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানি। আর এখন সবারই জানা গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হবার অতি দুর্লভ সন্মান অর্জন করেছে ইউলিসিস।
নতুন নতুন লেখকদের আড্ডা জমছে সমানে, তাদের বাউন্ডুলেপনা দেখে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা লেখিকা গ্যারট্রুড স্টেইন হেমিংওয়ে ও তার বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলে উঠেছিলেন – You are a Lost Generation! সোজা বাংলায় গোল্লায় যাওয়া প্রজন্ম। অথচ তারাই পরবর্তীতে আবির্ভূত হলেন একেকজন বিশ্বসাহিত্যের দিকপাল হিসেবে, মূল কারণ- শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানির আড্ডা, সাহচর্য, সাহায্য।
স্বপ্নপূরণের দিনে দোকানটিতে প্রবেশের আগে বেশ খানিকক্ষণ দাড়িয়ে রইলাম সাইনবোর্ডের দিকে চেয়ে, সেখানে শেক্সপীয়ারের অঙ্কিত মুখ আর নাম লেখা। দোকানের নামের শেষে কোম্পানির অর্থ বিশ্বের সমস্ত বইপ্রেমী এর অংশীদার, এমনটাই স্বপ্ন দেখতেন সিলভিয়ার পরে দোকানের দায়িত্ব নেওয়া জর্জ হুইটম্যান, যিনি নিজেকে আমেরিকান মহাকবি ওয়াল্ট হুইটম্যানের জারজ পৌপোত্র বলেই পরিচয় দেন দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে।
paris-shakespeare-bookstore-66.3
সামনে কাঠের বাক্সে কিছু বই আর দরজার পাল্লা ঠেলে ভিতরে পা দেওয়া মাত্রই বইয়ের সাম্রাজ্যে পদার্পণ! সব বিষয়ের উপর বই সামর্থ্য মত বিষয়ভিত্তিক সাজানো আছে। এক জায়গায় লেখা পয়েটস কর্নার, পিছনে রাজ্যের যত কবিতার বই।
293
সিঁড়িতে লেখা- মনুষ্যত্বের জন্য বাঁচো।
292
নতুন ও প্রথাবিরোধী সাহিত্যিকদের পাশে বরাবরই বন্ধুর মত দাঁড়িয়েছে শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানি, দেখলাম বীট জেনারেশনের সমস্ত বই কয়েক তাক জুড়ে থরে থরে সাজানো, তাতে জ্যাক কেরুয়াক, অ্যালেন গীন্সবার্গ, গ্রেগ্ররী করসোর ভিড়।
294
দোকানে আরেক অংশে উচ্ছন্নে যাওয়া প্রজন্ম অর্থাৎ হেমিংওয়ে ও তার সমসাময়িক আড্ডার লেখকদের সাহিত্যকর্মের সম্ভার।
286
প্রচুর ভিড় সেখানে, কিন্তু সবাইকে ক্রেতা ভাবলে ভুল করবেন! অনেকেই এক কোণে বসে পছন্দের বইটি টেনে নিয়ে পড়ে যাচ্ছেন নিবিষ্ট চিত্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দোকান যতক্ষণ খোলা আছে ততক্ষণ এই ভাবে বই পড়ার অধিকার আছে সকল পাঠকের! প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় নব্বই বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এর বাত্যয় ঘটেনি কোন।
284
আগে দোকানে বড় করে লেখা থাকত TAKE WHAT YOU NEED ,GIVE WHAT YOU CAN , মানে দোকানে বইয়ের নির্দিষ্ট কোন মূল্য ছিল না, এর দাম নির্ভর করত পাঠকের উপরেই! কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন, প্রতিটি বইয়ের সাথেই নির্দিষ্ট মূল্যের ট্যাগ, এবং দাম বেশ চড়া, নিশ্চয়ই এই অসাধারণ জায়গাটির ইতিহাসের কারণেই।
যেখানেই বিন্দু পরিমাণ জায়গা ফাঁকা পাওয়া গেছে সেখানেই বইয়ের স্তূপ, সেই সাথে দুর্লভ সব আলোকচিত্র ঝুলছে দেয়ালে আর কিছু পোষ্টার। একেবারে পিছনে গেলে পাওয়া যাবে দোতালায় যাবার কাঠের সিঁড়ি, উপরে জর্জ হুইটম্যানের আস্তানা এবং সেই সাথে পৃথিবীর একমাত্র লেখকদের হোটেল অর্থাৎ বিশ্বের যে কোন প্রান্তের লেখক এখানে এসে বিনামূল্যে রাত্রিযাপন করতে পারবেন! শুনলাম অন্তত ৪০,০০০ লেখক আজ পর্যন্ত থেকে গিয়েছেন এইখানে। অন্তত পারতেন বছর কয় আগেও, এখন দোতালায় করা হয়েছে গ্রন্থাগার আর সাহিত্য বিষয়ক নানা রকমের ওয়ার্কশপ চালানোর স্থান।
287
২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসী অধিক্রান্ত প্যারিসেও জ্ঞানের আলোর জ্বালিয়ে রাখত শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানি, কিন্তু পরে এক জার্মান ক্যাপ্টেনের হুমকির মুখে আত্নগোপন করেন সিলভিয়া হুইটম্যান, বছর চারেক পরে মিত্রবাহিনীর প্যারিস জয়ের পরে আবার খুলল সেই জ্ঞানের আঁধার, কল্পনা করুনতো মিত্রবাহিনী যখন এই বইয়ের দোকানে প্রবেশ করল তখন তাদের অগ্রভাগে কে ছিল? পুরোদস্তুর সৈনিকের ইউনিফর্ম গায়ে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে! তার বিখ্যাত স্মৃতিকথা A Movable Feast -এ সেই পুরনো দিনগুলোর কথা অমর হয়ে আছে।
কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের পর আগের সেই জায়গার দোকান আর চালু হল না, নিয়ে আসা হল তা সীন নদীর তীরে, যেখানে আমরা এখন দাড়িয়ে।
মন্ত্রমুগ্ধের মত সারা দোকান ঘুরে কিছু বই কেনা হল, সবার আগে ওয়াল্ট হুইটম্যানের লিভস অফ গ্রাস। এবার দাম চুকানোর পালা, কিন্তু সেখানেও রয়েছে এক বিশাল আকর্ষণ, শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানির বিশেষ সিল, যে কোন বইপ্রেমীর কাছেই এই সিল লাগানো বইয়ের মূল্য অপরিসীম, প্রমাণ হয় বইখানা এসেছে মহা গ্রন্থতীর্থ থেকে, মাঝখানে উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের ছাপচিত্র, তার চারপাশে দোকানের নাম, আর লেখা কিলোমিটার জিরো, প্যারিস।
Shakespeare-and-Company-Kilometer-Zero-Paris-stamp-courtesy-Nicholas-Laughlin-at-Flickr-CC-450x337
৯৭ বছরের চিরতরুণ সদাব্যস্ত জর্জ হুইটম্যান বাহিরে থাকায় দেখা করার সৌভাগ্য হল না, আশা রাখি অদূর ভবিষ্যতে নিজের কোন বই প্রকাশিত হলে বুক ঠুকে এসে অন্তত একরাত থাকার অনুমতি চাইব, এই স্বপ্ন বুকে পুষেই বিদায় নিলাম এই যাত্রা।
http://www.sachalayatan.com/node/41127